করোনা মহামারী-পরবর্তী সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিশ্ব যখন কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছিল, ঠিক তখনই এ যুদ্ধ নতুন এক সরবরাহ সংকটের শঙ্কা তৈরি করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন সংকট মোকাবেলায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ২০২১ সাল থেকে করোনা মহামারী এবং ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে যে মূল্যস্ফীতি দুই অংকের ঘরে পৌঁছেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। বিশ্বের প্রধান উন্নত দেশগুলোর শ্রমবাজার এখন আগের চেয়ে অনেকটা দুর্বল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতিও বেশ কঠোর ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন বছর মূল্যস্ফীতির হার ক্রমান্বয়ে কমতে দেখা গেছে। তবে পরিস্থিতি বদলেছে যুদ্ধের কারণে। বেসরকারি খাতের অর্থনীতিবিদরা এখন নতুন করে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়াচ্ছেন এবং প্রবৃদ্ধির হার কমাচ্ছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি পণ্যের দাম দীর্ঘমেয়াদে বাড়লে তা ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব ফেলবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের কর্মকর্তা জেনস লারসেন বলেন, ‘সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এ পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছানো এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ায় সুদহার কমানোর যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন ফিকে হয়ে আসছে।’
মার্চে প্রকাশিত কনসেনসাস ইকোনমিকসের জরিপ অনুযায়ী, জি-৭-ভুক্ত ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোয় ২০২৬ সালের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস আবারো বাড়িয়েছেন বিশ্লেষকরা। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি গড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে।
বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত সুদহারে কোনো পরিবর্তন না আনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে সংঘাতের প্রভাবে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের ধারণা, ইসিবি বিদ্যমান ২ শতাংশ সুদহার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও পরবর্তী পদক্ষেপে সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর আগে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনবে ও ইসিবি সুদহার স্থিতিশীল রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্র নেট জ্বালানি রফতানিকারক দেশ হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও ইউরোপের তুলনায় দেশটি তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরও যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের সুদহার কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে। সিএমই গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, সুদহার নিয়ে কাজ করা ব্যবসায়ীদের ৪৭ শতাংশই এখন মনে করছেন, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের সুদহার আর কমবে না। অথচ এক মাস আগেও এ হার ছিল ৫ শতাংশ ।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি ২০২২ সালের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। এখন প্রধান অর্থনীতিগুলোয় মুদ্রানীতি হয় নিরপেক্ষ, নয়তো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মহামারীর ধকল কাটিয়ে ওঠার পর অনেক দেশ বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনেছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বড় ধরনের বাজেট ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
শ্রমবাজারের চিত্রও এখন আগের তুলনায় বেশ আলাদা। ২০২২ সালে চাকরির ব্যাপক চাহিদার কারণে কর্মীদের ধরে রাখতে কোম্পানিগুলো আকর্ষণীয় বেতন দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে শ্রমবাজার কিছুটা ঢিলেঢালা হওয়ায় পণ্যের দাম বাড়লেও দ্রুত বেতন বাড়ানোর প্রবণতা কমেছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের নীল শেয়ারিংয়ের মতে, যদি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে, তবে তা রাশিয়ার জ্বালানি সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো এ সংকটের স্থায়িত্ব। তিনি জানান, গত পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতির ক্ষতের কারণে নীতিনির্ধারকরা বাড়তি চাপে আছেন। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভোক্তা পণ্যের দাম ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য ও পানীয়ের দাম ইউরোপে ৩০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পণ্য ও খাদ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ফের দ্রুত বাড়তে পারে।
নোমুরার অর্থনীতিবিদ জোসি অ্যান্ডারসনের মতে, গ্যাসের দাম বাড়ায় ইসিবি এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। আগেরবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতিকে ‘ক্ষণস্থায়ী’ বলেছিল, কিন্তু এবার তারা সে ভুল করতে রাজি নয়। অন্যদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড আগের দেয়া সুদহার কমানোর পরিকল্পনার ব্যাপারে বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকরা তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ না নিলেও তাদের বক্তব্যে সতর্কবার্তা স্পষ্ট থাকবে।
অর্থনীতিবিদ মরি অবস্টফেল্ডের ভাষায়, ২০২২ সালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মূল্যস্ফীতিকে ‘সাময়িক’ বলে ভুল করা যাবে না, নীতিনির্ধারকরা সে সতর্কতাই এখন বজায় রাখবেন।